মুক্তিযুদ্ধের কিছু কথা

যতদুর মনে পড়ে, সেটা ৪ঠা এপ্রিল ১৯৭১। আমার বয়স তখন আঠারো। আমি নারায়নগঞ্জের লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চে করে রামচন্দ্রপুর যাই এবং সেখান থেকে বহু মাইল পথ পায়ে হেটে ভারতের আগরতলায় গিয়ে উঠি এবং সেখানে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম লেখাই। আগরতলা থেকে আমাদের একটা গ্রুপকে নিয়ে যাওয়া হয় মেলাঘর হেডকোর্য়াটারে ট্রেনিং এর জন্য (তখন পূর্বাঞ্চলের মুক্তিবাহীনির হেড কোয়ার্টার ছিল ভারতের মেলাঘরে)। দুইমাস ট্রেনিং প্রাপ্তির পর মোট দুই বার বাংলাদেশের ভিতরে এসে পাকিস্তানীদের উপর হঠাৎ হামলা করে আবার ভারতে ফিরে যেতাম।

তৃতীয়বার আমি যখন ঢাকায় আসি ঢাকার ভেতরে পাকিস্তানী আর্মিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষন করার জন্য এবং পর্যবেক্ষন শেষে যখন রিপোর্ট করার জন্য ভারতে যাওয়ার জন্য রেডী হচ্ছিলাম, তখন আমার দুই বন্ধু বাসাবো এলাকা থেকে, ফজলু ও শাহ্‌জাহান আমার সাথে ভারতে যাবে বলে, আমার সাথে রওয়ানা হয়। এটা আমার ৩য় যাত্রা। আমাদের যাওয়া আসার রুট ছিল প্রধানতঃ মেলাঘর সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে রামচন্দ্রপুর হয়ে ঢাকার কাজলা অথবা মান্ডা দিয়ে ঢাকা।

১৯৭১, ৫ই আগস্ট - আমরা প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে একটি নৌকা ভাড়া করে কুমিল্লার রামচন্দ্রপুর হতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পের ভারতের মতিনগরে (পরবর্তী পর্যায়ে মেলাঘর থেকে মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টার নিয়ে যাওয়া হয় মতিনগরে) কোম্পানীগঞ্জ বাজারের কাছ দিয়ে একটা ব্রিজের তলা দিয়ে যাওয়ার পথে নৌকার ভেতর থেকে শুনতে পেলাম 'এই মাঝি দাড়াঁ'। আমরা তখন নৌকার গলুইয়ের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম প্রায় ১০/১৫ জন রাজাকার রাইফেল উচিঁয়ে আছে। আমার সাথে ছিল একটা ঋরৎব এৎধহবফ। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি ওই গ্রেনেডটা খালের পানিতে ফেলে দিলাম। মাঝি তখন বাধ্য হয়ে নৌকা থামালো। আমি তখন একটা লুঙ্গি আর একটা স্যন্ডো গেঞ্জি পরে ছিলাম আর আমার পাঞ্জাবীটা নৌকার গলুইয়ের ভিতর ঝোলানো অবস্থায় ছিল। আর আমি একদম ভুলেই গিয়েছিলাম যে সেই পাঞ্জাবীর পকেটে ছোট্ট একটা নোটবুক ছিল। আর সেই নোটবুকে প্লান্টিক এঙ্প্লোসিভ ও টিএন্ডটি ব্যবহারের কিছু তথ্য লেখা ছিল। রাজাকাররা তখন আমাদের নৌকা থেকে নামিয়ে আনলো। তারপর নৌকা তল্লাশী করে সেই পাঞ্জাবীর পকেটে সেই নোটবুকটা নিয়ে তাদের (রাজাকারদের) মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত বাঙ্গালী আর্মির লোক ছিল তার কাছে দিয়ে দেয়। সে আমাদের অনেক মারধোর করে নোটবুক সম্মন্ধে জানার জন্য, কিন্তু আমরা এটার ব্যপারে কিছুই জানিনা বলে জানাই। অনেকদিন পর্যন্ত তার নামটা আমার মনে ছিল। এখন নামটা ভুলে গেছি।

তারপর সেই রাজাকারেরা আমাদের দুই হাত পেছন দিকে বেধে পাকিস্তানী আর্মি ক্যম্পে নিয়ে গেলো। আমাদের তিনজনকে মুক্তি বাহিনীর লোক বলে প্রাথমিক অত্যাচার করল। সেটার বর্ণনা নাই দিলাম। ঘন্টা দুয়েক পরে একটি জিপ গাড়ীতে করে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ময়নামতি কেন্টনম্যন্টে। পরবর্তী পাঁচদিন আমাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হলো। ওরা শুধু আমাদের মুখ থেকে জানতে চাচ্ছিল যে আমরা মুক্তি বাহীনির কিনা। ৬ দিনের দিন পাকিস্তানীরা আমাদের তিনজন এবং আরো ১০ জন বন্দীকে একত্রিত করে ময়নামতি ক্যন্টনম্যন্টের ভিতরেই কোথাও এক অফিসে নিয়ে গেলো। আমি আবার ভালো উর্দু ভাষায় কথা বলতে পারতাম এমনকি টুকটাক পাঞ্জাবী ভাষায়ও কথা বলতে পারতাম। আমি কান্নাকাটি করে বারবার পাকিস্তানীদের বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম যে আমরা মুক্তিযোদ্ধা নই আমরা শাহ্‌জাহানের নানার বাড়ীতে বেড়াতে যাচ্চিলাম আর রাজাকারেরা আমাদের ধরে এনেছে। আর শাহ্‌জাহানের নানাবাড়ী ছিল ধনিরামপুর নামের একটা গ্রামে যেটা নাকি কোম্পানীগঞ্জ থেকে পাঁচ ছয় মাইল উত্তর পূর্ব দিকে। কিন্তু তারা আমাদের কোন কথা শুনলো না। আর্মিরা আমাকে অন্য দুজন আর্মির কাছে একা বসিয়ে রেখে বাকী ১২ জনকে নিয়ে একটি পাহারের আড়ালে চলে গেলো। আমি তখন একা একা বসে ভয়ে কাঁপছি। প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর হঠাৎ কতগুলো গুলির আওয়াজ শুনলাম। কিছুক্ষন পরে সেই আর্মিগুলো ফেরত এলো কিন্তু সাথে আমার সঙ্গীরা নাই। ফজলু ও শাহ্‌জাহানও সেখানে নাই। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে।

এভাবে আরো দুইবার সেখানকার বন্দীদেরকে ১০/১৫ জনের গ্রুপে ভাগ করে তারা নিয়ে যেতো এবং কিছুক্ষন পরে আমরা গুলির আওয়াজ শুনতাম, আর তখনই আমরা বুঝতে পারতাম যে তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে তারা আমাকে এভাবে তিনবার তিনটি গ্রুপের সাথে নিয়ে গেছে এবং একমাত্র আমাকেই ফেরত নিয়ে এসেছে। হয়তো আমার ভাগ্যে সেই সময় মৃত্যু লেখা ছিলনা তাই আমি আজো বেচে আছি। কিন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নয়, বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে। একমাত্র আমার কিছু বন্ধুবান্ধব ও আত্নীয়স্বজন ছাড়া কেউই জানেনা যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। একবার অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে নাম লিপিবদ্ধ করার জন্য ৪ পৃষ্টার একটি ফরম পূরণ করে ইস্কাটনের মুক্তিযোদ্ধা অফিসে জমাও দিয়েছিলাম, কিন্তু আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা অফিস থেকে কোন সাড়া পাইনি আর আমি আর কোন চেষ্টাও করিনি। কি দরকার, দেশের জন্য একটা দায়িত্ব ছিল সেটা পালন করার চেষ্টা করেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।